মুঘলসরাই জংশন – দেবেশ ঠাকুর Mughalsarai Junction kobita

প্রিয়জনের কাছে শেয়ার করুন :—

মুঘলসরাই জংশন
গভীর রাতের ট্রেন থেকে
প্ল্যাটফর্মে এসে নামলেন একজন বৃদ্ধ
বয়স আশি নব্বই এমনকি একশোও হতে পারে
জানুয়ারি মাস প্রবল শীত
প্রায় নির্জন প্লাটফর্মে দিশাহীন উদ্দেশহীন
একা একা হেঁটে চলেছেন বৃদ্ধ
আরও এক অনিশ্চয়ের দিকে
সারা শরীরে একটি কটিবস্ত্র ছাড়া
কোথাও কোনো আবরণ নেই
সহসা রেলের টি টি অবাঞ্ছিত বৃদ্ধকে দেখে
জিজ্ঞাসা করলেন, আপ কৌন হ্যয়
বৃদ্ধ মেরুদন্ড সোজা করার চেষ্টা করে বললেন,
আই এন এ–
টিটি এবার বললেন, টিকট দিখাইয়ে–
বৃদ্ধ আবার বললেন, আই এন এ
টি টি আর দায়িত্ব নিলেন না
( রাষ্ট্র যেমন দায়িত্ব তাসের মত অন্যের হাতে দিয়ে দেয়)
সরাসরি সন্দেহভাজন ন্যুব্জ বৃদ্ধকে নিয়ে টি টি
উপস্থিত হলেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সমীপে
ঊর্ধ্বতন দীর্ঘ অভিজ্ঞতার চোখ
মাথা থেকে পা পর্যন্ত আবার পা থেকে মাথা পর্যন্ত
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বললেন,
আপনি কি বাঙালি বিহারি তামিল তেলুগু মালয়ালি কন্নড়
সেই একটি উত্তর আবার বেরিয়ে এল বৃদ্ধের মুখ থেকে,
আই এন এ–
ঊর্ধ্বতন চোখদুটো আরও সরু করে সন্দেহতর হয়ে
জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি উগ্রপন্থী আতঙ্কবাদী জঙ্গি
তারপরেই প্রশ্নপর্বে না গিয়ে আর পি এফ-কে বললেন,
দেখতো শরীরে কোথাও একটা গ্রেনেড
কিংবা এ কে পার্টি সিক্স লুকানো আছে কিনা
যার শরীরে জানুয়ারির গভীর শীতে
একটি কটি বস্ত্র ছাড়া কোথাও কিছু নেই
সে কোথায় লুকিয়ে রাখবে এইসব মারণাস্ত্র
অযাচক দায়িত্ব আর নিতে চাইলেন না ঊর্ধ্বতন
তাচ্ছিল্যে বললেন, যাও জি আর পি থানার লক্ আপে
রাত্তির কাটাও

জিআরপি থানার লক আপের
হিমশীতল মেঝের উপর পড়ে রইল
আমার নিরন্ন স্বদেশ
আমার বিপন্ন ভারতবর্ষ
রাত বাড়লে
রেলের জমাদারনি দুটো পোড়া রুটি
বৃদ্ধের মুখের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
বাবা, আগর বুরা না মানো তো–
কতদিন অনশনের পর এই অর্ধাশন
এত মমতাময় সম্ভাষণ
বৃদ্ধের চোখ থেকে জলধারা নেমে এলো
জমাদারনি জলের ঘটি বৃদ্ধের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
বাবা, আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?
— হ্যাঁ মা ঠিক বুঝেছো, আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি–
— কাকে?
— আমার আত্মীয়দের
— এত বড় দেশ। নাম ঠিকানা না জানলে
কোথায় পাবেন আত্মীয়দের
বৃদ্ধ কোমরের কাপড়ের ফালি থেকে
বের করলেন একটি কাগজের টুকরো
হলুদ শতচ্ছিন্ন বিবর্ণ কাগজ
জমাদারনি দেখলেন চারটি নাম শুধু সেখানে লেখা
— এঁরাই আপনার আত্মীয়? কোথায় থাকেন?
— এঁদের নামই এঁদের ঠিকানা–
কাগজের টুকরোর প্রথম নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী
— জানো মা, মোহনদাস বলেছিলেন আমাদের দেশে
কোন হিংসা থাকবে না রক্তপাত থাকবে না ঘৃণা থাকবে না

আজও মানুষ বড়ো বিপন্ন হানাহানিতে ক্লান্ত ভাগাভাগিতে জীর্ণ
আজ মোহনদাসকে বড় দরকার
যেমন করে এইতো সেদিন ছেচল্লিশে
নোয়াখালিতে সাঁকোর উপর দাঁড়িয়ে বলেছিলেন,
পহলে মুঝে মারো পর দুসরো কি উপর হাত উঠাও

সহসা সেই প্রায় অন্ধকার লক্ আপে
বৃদ্ধ আলোর মতো একটি মানুষকে যেন দেখতে পেলেন
চিৎকার করে বলে উঠলেন, সর্বাধিনায়ক
সেই তের বছর বয়সে আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগদান
করবো বলে
তোমার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম
সেই পঁয়তাল্লিশে
তোমার পাশে দাঁড়িয়ে তোমার গলায় গলা মিলিয়ে বলেছিলাম,
দিল্লি চলো-

তারপর কতদিন কেটে গেল
সারাদেশের সব প্রান্তে তোমায় খুঁজে বেরিয়েছি
কারও সামনে যদি বলি আমি আই এন এ-র লোক
আমি আজাদ হিন্দ ফৌজে সুভাষচন্দ্রের পাশে ছিলাম
পাগল ভেবে আমায় কাদা ছোঁড়ে
আমায় অপমান করে নিগ্রহ করে
অসম্মান আর ভুলে যাওয়ার জন্যই কি জীবন
আমি যে ভুলতে পারিনা নেতাজি

আর
নেহরুজি, সাতচল্লিশের পনের আগস্ট
দিল্লির লালকেল্লা থেকে সরে গেল ইউনিয়ন জ্যাক্
আমাদের তেরঙ্গা জাতীয় পতাকা তোমার হাত ধরে
পত পত করে উড়তে লাগল পরম বিশ্বাসে
আর সেই গভীর রাত্রে তোমার বেতার ভাষণ
আজও কানে শুনতে পাই
দেখতে পাই প্রথম স্বাধীনতা দিবসের প্রথম সূর্য


কী বিশ্বাস কী আস্থা কী প্রবল আত্মমর্যাদা….
তারপর বহু বছর কেটে গেল
টুকরো টুকরো হয়ে গেল দেশ
একজন কবি যে ভাঙন রুখতে পেরেছিলেন
তোমরা এতো জন রাজনীতিবিদ দার্শনিকেরা তা পারনি
একদিকে কুবেরের ভান্ডারে কোটি কোটি টাকা
অন্যদিকে বিপন্ন নিরন্ন মানুষ ফুটপাতে রাত কাটায়
তোমার সেই স্বপ্নের দিন কবে আসবে নেহেরুজি
কবে কবে আবার কবে সব মানুষ
ভাত পাবে ছাদ পাবে কাপড় পাবে ইশকুলে যাবে ওষুধ পাবে!
কবে কবে–

এবার জি আর পি থানার লক্ আপের
জং ধরা লোহার ফাটক খুলে দেওয়া হল
বৃদ্ধ এক পা এক পা করে বাইরে বেরিয়ে এলেন
এদিক ওদিক চেয়ে দেখছেন
দেখছেন চারিদিকে রেললাইন
উত্তরে দক্ষিণে পূর্বে পশ্চিমে
এর যে কোন একটা ধরে
ভারতবর্ষের অন্তরে পৌঁছে যাওয়া যায়
যাওয়া যায় ভারতের অন্দরে
বৃদ্ধ হাতড়ে বেড়াচ্ছেন স্বদেশের রাস্তা
রেলের মাইক যেন বলছে, ক্যুও ভাদিস দোমিনি
পথ কোথায় বলে দাও–
সহসা জমাদারনির চার বছরের শিশুপুত্র
ছুটে এসে দিশাহীন বৃদ্ধের হাত চেপে ধরে
বলে, আও আও মেরে সাথ
— তোমার সঙ্গে? কোথায় তুমি নিয়ে যাবে হে আগামীর শিশু?
দুটো হাত ছড়িয়ে দিয়ে শিশু বলে, মেরা ঘর হমারা ঘর
— কোথায় সেই ঠিকানা তোমার ঘরের?
শিশু আরও বিস্তৃত করে হাত
চিৎকার করে বলে,ভারতবর্ষ হিন্দোস্তান…

চোখের সামনে দেখতে পেলেন সূর্য উঠছে
পূর্ব দিক লাল করে আর একটা বিশ্বাসের সূর্য
কতদিন পরে বৃদ্ধ উচ্চারণ করলেন
‘ জবা কুসুম সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্
ধান্তারিং সর্বপাপঘ্ন প্রণোতস্মি দিবাকরম’..
হে জ্যোতির্ময় রবি
আরো আলো দাও আরো প্রাণ দাও তমসা দূর কর
আলো আলো আলো আরো আলো দাও
জ্যোতির্ময় রবির কথা বলতেই মনে এলো
আর এক রবি
যিনি বলেছিলেন, জয় হবে
মানবতার জয় মনুষ্যত্বের জয় ভারতবর্ষের জয় ভারতাত্মার জয়
এই জয়ধ্বনি শোনা যাবে প্রতি মুহূর্তে
সেই রবির কন্ঠে ধ্বনিত হতে থাক,
‘ জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা…’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *