বাবা বলেছিলেন, উনিশশো সাতচল্লিশের পনেরোই অগাস্ট
ভারত স্বাধীন হল, আর আমরা আমাদের দেশ হারালাম
স্পষ্ট মনে পড়ে বাবার অপমানিত মুখ আর
ধরা-ধরা গলা
আমি তখন তেরো, কথাটার মর্ম ঠিক বুঝিনি
মন ছটফট করছিল বাইরের হুল্লোড়ে গলা মেলাবার জন্য
প্রভাত ফেরিতে বাজছিল বিউগল, পাশের বস্তির বাচ্চারা
কী নিয়ে চেঁচামেচি করছিল কে জানে
মহাত্মা গান্ধী এই শহরেরই কোথাও খাটিয়ায় শুয়ে আছেন
কে যেন বলছিল, তিনি কাঁদছেন খুব
আমার মা-ও ছলছলে চোখে বলে উঠলেন, চাঁপা ফুলের
গাছটা আমি নিজের হাতে লাগিয়েছি
এ বছর সেই গাছে ফুল ফুটবে, আমি আর দেখতে পাব না?
লাহোর না এলাহাবাদ, কোন শহরে যেন হোটেলের ঘরে বসে
গরমে ঘামতে ঘামতে র্যাডক্লিফ নামে এক ইংরেজ
কাটাকুটি খেলছেন ভারতের মানচিত্র নিয়ে
তিনি আমার মায়ের চাঁপা ফুল গাছের কথা কিছুই জানেন না।
ঝড়ে উড়ে যাবার মতন এক একটা গ্রাম চলে যাচ্ছে
সীমান্তের এপারে ওপারে
কারুর রান্নাঘর গিয়ে পড়ল নতুন দেশে, কোনো গৃহস্থের
গোয়ালঘর রয়ে গেল পুরনো রাজ্যে
অনেক নদীও দু’ভাগ হয়ে গেল
লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন তছনছ হয়ে গেল
স্বাধীনতার মূল্য দিতে গিয়ে
পাঞ্জাব ও বাংলা, যেখানকার ছেলেরা জীবন পণ করে
সবচেয়ে বেশি লড়াই করেছে দেশের মুক্তির জন্য
সেই দুটো রাজ্যই কেটে ফেলে বইয়ে দেওয়া হল রক্তগঙ্গা!
আমার কাকা আন্দামান জেল থেকে ফিরে এলেন
ঠিক সতেরো বছর পর
যেন রিপ ভ্যান উইংকল, ভেবেছিলেন চোখ মেললেই দেখতে
পাবেন পুরনো স্বদেশ
সমুদ্র পেরিয়ে এসে যখন চোখ মেলালেন
কে যেন প্রচণ্ড এক ঘুসি মারল তাঁর চোখে
তিনি দেখলেন, র্যাডক্লিফের ছুরিতে দ্বিখণ্ডিত ভূমির
যেখানে সেখানে ক্ষত
তিনি দেখলেন, মানুষ আর মানুষ নেই, শুধুই
হিন্দু কিংবা মুসলমান
ফজল চাচার ঘুড়ির দোকান আগুনে পুড়ে ছাই
শুভ্র দাড়িওয়ালা এক দরবেশ, যিনি মাথায় চামর বুলিয়ে
আদর করতেন সকলকে
তাঁর লাশ ট্রাম লাইনের পাশে পড়ে ছিল তিনদিন
প্রেসিডেন্সি কলেজে কাকার সহপাঠিনী রেহানা সুলতানাকে
কামড়ে, ছিঁড়ে খেয়েছে কয়েকটা রাক্ষস
আর শিয়ালদা স্টেশনের সব প্লাটফর্ম জুড়ে শুয়ে আছে
ওপারের গৃহহারা ছিন্নমূল মানুষ
কোনও জননীর এক সন্তান মারা গেছে পথে, অন্যটি খিদেয়
কাঁদছে
হাতে ভিক্ষের পাত্র, এক পুরোহিত একেবারে নির্বাক
শ্যামলী নামের ধর্ষিতা মেয়েটির রক্তস্রাব বন্ধ হচ্ছে না কিছুতেই
সেই সব পরিবারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আন্দামান-ফেরত
বিপ্লবীটি প্রত্যক্ষ করেন স্বাধীনতার স্বরূপ
এক বৃদ্ধ চিৎকার করে উঠল, শুয়োরের বাচ্চা গান্ধীটা মেনে নিল
দেশভাগ?
তার পেয়ারের জওহরলালকে কিছুতেই বোঝাতে পারল না?
আজ যদি সুভাষ বোস থাকতেন এখানে…
সেই চিৎকারের প্রতিধ্বনি যেন পৌঁছে গেল দিল্লিতে
এই মহারাষ্ট্রীয় যুবকের হাতে প্রার্থনাসভায় খুন হলেন গান্ধীজি।
সতেরো বছর আগে আমার কাকা ছিলেন এক বলিষ্ঠ
ডাকাবুকো যুবক
ধরা পড়ার আগে দেড় বছর পলাতক
তখনো রোজ ভালো করে খাওয়া জুটত না
আন্দামান জেলে নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ারের কয়েকজন গার্ড
প্রায়ই তাঁকে মাটিতে চেপে ধরে যৌন বলাৎকার করত
অত্যাচারের ভাষা ছাড়া তারা আর কোনো ভাষাই জানে না
কাকা যখন ফিরে এলেন, তখন সেই সুপুরুষটিকে আর চেনা যায়
না
যেন এক দেশপ্রেমিকের প্রেতচ্ছায়া
ওঁকে একদিন ভালো করে খাওয়াবার জন্য ব্যবস্থা হল
একটা বড় কাঁসার থালায় সুন্দর করে সাজিয়ে দেওয়া হল ভাত
আর কয়েকটা বাটিতে সোনামুগ ডাল, ঝিঙে-পোস্ত, ভাপা ইলিশ
আর গলদা চিংড়ি
মাটিতে পেতে দেওয়া হল আসন
সেই আসনে বসে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন কাকা
তাঁর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল জল
একটু পরেই ভাতের থালাটি ঠেলে সরিয়ে উঠে পড়লেন
আর কোনোদিন তিনি নিরামিষ ছাড়া কিছুই খাননি
কয়েক মাস পরেই তিনি চলে গেলেন তাঁর জেল-সঙ্গী
উল্লাসকর দত্তের কাছে
ওঁরা দু’জন মুখোমুখি চুপ করে বসে থাকতেন
যেন সব কথা ফুরিয়ে গেছে।
জন্ম থেকেই স্বাধীনতা নামের শিশুটি বিকলাঙ্গ
তবু তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা হয়েছে অনেক যত্নে
তার গায়ে বারবার বদলে বদলে যে-জামাটি পরানো হয়েছে
তার নাম গণতন্ত্র
পাশের নতুন দেশটি কিন্তু সে পোশাকের তোয়াক্কা করেনি
বারবার খুনোখুনি ও সামরিক শাসনে তা রক্তাক্ত ও পরিত্যক্ত
হয়েছে
তারপর তো একসময় ভেঙে দু’টুকরোই হয়ে গেল
এই পুরনো দেশটা কিন্তু ভাঙল না
যদিও সীমান্তে ও পাহাড়ে মাঝে মাঝে বন্দুক গর্জায়
মাথার কাছে কাশ্মীর নিয়ে লাগাতার মাথাব্যথা
তবু ভাঙল না
অনেক ফুটোফাটা ও তাপ্পিমারা হলেও সেই আলখাল্লাটাও
গায়ে ঠিকই জড়ানো আছে
মানুষের বয়েস আর দেশের বয়েস তো এক নয়
ষাট বছরেও এ দেশ সবেমাত্র কৈশোরে পা দিয়েছে
হাত-পাগুলো ঠিকঠাক হয়েছে, কথা ফুটেছে মুখে
খেলাধুলো খুব একটা পারে না, কিন্তু গান-টান গায় বেশ
এবার একদিন চাঁদের দিকে একটা রকেট ছুঁড়ে দেবে!
মৃত্যুর আগে বাবা বারবার বলেছিলেন কাতরভাবে
আমি বাড়ি যাব, আমাকে একবার বাড়িতে নিয়ে চল
আমরা তা পারিনি, বাড়ি মানে জন্মস্থান, তা কবে মিলিয়ে গেছে
অন্যদেশে
বাবা শেষ পর্যন্তও এ দেশকে নিজের দেশ বলে ভাবতে পারেননি
আমার ছেলের কাছে ঐ সব গল্পকথা আর পুরনো ইতিহাসের
কোনো মূল্যই নেই
মানুষ ইতিহাস নিয়ে বাঁচে না, বর্তমান নিয়ে বাঁচে
বাবা-কাকারা সব মিলিয়ে গেছেন অতীতে
আমাদের মনে স্মৃতির দুঃখ বিলাস ফিরে আসে মাঝে মাঝে
আমাদের সন্তান-সন্ততিরা এই পুরনো দেশটাকেই
নতুন ভাবে গড়তে চাইছে
মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখি, সাহেবরা আবার ফিরে আসছে
এবারে আর অস্ত্র নিয়ে নয়, চাকরি চাইতে
একটি আন্তর্জাতিক এলিট স্কুল খোলা হয়েছে আমাদের
রাজধানীতে
সেখানকার ছাত্র বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপতি ও সেনাপতি
তাদের শেখানো হচ্ছে গণতন্ত্র
বিভিন্ন ধর্মগুলোকে বাড়ির মধ্যে বন্দি করে রেখে
প্রকাশ্য রাস্তায় সব মানুষই আবার মানুষ হয়েছে।
