কাদম্বরী — দেবেশ ঠাকুর

প্রিয়জনের কাছে শেয়ার করুন :—

তোমার শরীরের ময়নাতদন্ত করতে দেননি

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ – তোমার জাঁদরেল শ্বশুরমশাই

পাছে কাটা ছেড়া করলে সত্যটা বেরিয়ে পড়ে-

বেরিয়ে পড়ে ঠাকুরবাড়ির সবচেয়ে উপেক্ষিতা নারী

আর উপেক্ষিত পুরুষটির ভালবাসার হৃদয়পদ্ম!

 

ঠাকুরবাড়ির বাজার সরকারের মেয়ে

বংশ, সম্মান, গাঁই, গোত্র, কৌলীন্য-কিছুতেই মেলে না

বিশেষতঃ জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মত অসামান্য নতুন পুরুষটির সঙ্গে

লজ্জায় বাড়ি আলোকপ্রাপ্তা জ্ঞানদানন্দিনী

তুমি মুখ বুজে পড়ে রইলে নৈরাশ্যের আশ্রয়ে

এমন সময় পেলে স্কুল পালানো ছেলেটিকে

তোমার সাধের আসন বোনার সেই সুত্রপাত

নিজেকে গড়ে নিলে নিজের মাধুর্যের ছাঁচে

ছাদে সাহিত্যের পদ্মবনে এলো মধুকর

 

তোমার লীলাসঙ্গী ভানুসিংহ

হয়তো একটা নীড় গড়তে চেয়েছিলে লীলাচ্ছলে

সমাজ নষ্ট করে দিলো সেই নীড়

পদ্মবনে তখন মদমত্ত হাতির দাপাদাপি

জ্যোতিদাদার দিন কাটে থিয়েটারে

রাত কাটে বিরজিতলায়- বালিগঞ্জে

জোড়াসাঁকোয় অন্ধকার বিষ্ণুপ্রিয়া রাত নামে

স্বামীর পকেটে তাড়াতাড়া প্রেমপত্র- নিশ্চয় তোমাকে নয়

ফ্লোটিলা জাহাজে সবাই যাবে প্রমোদ ভ্রমণে

শুধু তুমি বাদ- সবচেয়ে উপেক্ষিতা, সবচেয়ে নষ্ট মানুষ

বোদলেয়ারের কল্পনার মত শুকনো ইচ্ছে

শেষে ভানুকে কেড়ে ছিন্ন করে বিলেত পাঠালো ওরা

হেমাঙ্গিনী তখন হেকেটি অথবা শুধুই ‘হে’

তবু বিরহী রাধার যন্ত্রনায়

পরতে পরতে বিচ্ছেদ – বিপন্নতা

অবশেষে ভানু ও ভবতারিনীগত হয়ে

শতপাকে জড়িয়ে ক্লিষ্ট হয়ে গেল

 

কত যন্ত্রনায় মানুষ আত্মহত্যা করে, নতুন বউ

তুমি জানতে না।

কেটে ছিঁড়ে তোমাকে চিলশকুনের মুখে তুলে দেওয়া হবে!

জানতে না, ভিসেরা হবে, পুলিশী কুৎসা হবে।

সামাজিক ছিছিক্কার হবে।

 

ভাগ্যিস মরেছিলে নতুন বউ

বেঁচে থাকলে সম্পত্তির মোকদ্দমা লেগে থাকতো ভানুর সঙ্গে

বেঁচে থাকতে উপেক্ষিত মেয়ে মানুষ হয়ে।

মরণের পরে নারী থেকে মানুষ হলে,

হয়ে গেলে জীবন দেবতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *