জন্মাষ্টমী — শ্বেতা চক্রবর্তী

প্রিয়জনের কাছে শেয়ার করুন :—

যমুনার তীরের ষোলোশো গোপিনী সঙ্গে তুমি খেলায় মেতেছিলে,

আমি চারুমতি,বাবা,

কী যে মনোহর কর্পূরবাসে আমোদিত ছিল চারদিক,

তোমার শরীরে চন্দনবন,তাদের শরীর রজনীগন্ধা সার,

শাম্ব ভাইটি অপলক হয়ে দেখছিল আর কবিতায় ডুবে লিখছিল কত কিছু…

 

তুমি শুধু তবু একজনকেই মালা পরালে,

চুম্বন দিলে,আলিঙ্গনেও ভেসে গেল বসুধা,

নারীটির স্বামী মাদার বনের দিকে বুক চাপড়াচ্ছিল,

তার বুকে যত ব্যথা,যতটা হিংসে,তুমি কি তা জেনেছিলে?

তুমি শুধু জানো প্রেম নেওয়া যার স্বভাব,

সে দেখে না তো অশ্রুর দাম কত,

মানুষের দামে ধার্য হয় না পৃথিবীর সব ক্ষত।

 

সেদিন কতটুকু ক্ষতি ছিল যে রাধার,

কতটখানি ক্ষতি ষোলশত গোপিনীর,

কতখানি ক্ষতি আয়ান ঘোষের,

কত বড় ক্ষতি রুক্মিণীমার আমার…

 

পৃথিবীর যত নদীর কান্না জড়ো করে সেইদিন কেঁদেছিল যমুনা,

গোপিনীর হাসি কান্না মেশানো মধু,

রাধার শরীরে তোমার মোহন জাদু,

তবুও তো দেখো ফুটেছিল যেন জল বসন্ত দাগ,

এ দাগ মেলাতে মৃত্যুও লেগে যাবে,

জেনেও রূপসী কলঙ্ক-বৈভবে

আমাথা ডুবিয়ে খেলেছিল খেলা সার,

 

পৌর্ণমাসীর ব্রতের সে দিন নয়,

বসন্ত পূর্ণিমাও না তা,

রাগিণীর দল কুসুমে কুসুমে গেয়ে উঠেছিল প্রাণ,

সেদিন এমনই ভাদ্রের দিন,জল্পনা অফুরান,

বুকের মধ্যে বাদনের সুর,খেত ভরা কল্পনা,

সেদিন তোমার জন্মতিথি,জন্মাষ্টমী ছিল,না?

 

আমার মায়ের চোখের আখরে তোমার নামের কাজল

লেপটে গিয়েছে,

শতবার করে ক্ষত নিতে চেয়ে মা আমার অক্ষত,

রাধার সঙ্গে,গোপিনীর দলে তুমি ছিলে নির্মাণ!

 

আমি চারুমতি,মায়ের মতন আমারও নারীর প্রাণ,

কেঁপে উঠেছিল,কেঁদে উঠেছিল,

অভিশাপ দিলে শাম্বভাইকে,

ওর সমস্ত শরীর বেঁকে যাচ্ছিল কুষ্ঠরোগের দিকে..

 

আমিও সেদিন,আমি চারুমতি,তোমারই তো কন্যা,

অভিশাপ দিয়ে তোমায় বলেছি,আগুনের মতো তাপে

তুমি যাতে জ্বলো,সমস্ত দিন,

তুমি যাতে কিছুতেই শান্তি না পাও!

 

তারপর ফিরে জরা নামে ব্যাধকে বলেছি,

শেষ করে দাও আমার বাবাকে এবার,

জরা মাথা নিচু,ধীরে ধীরে বলেছে,

অদ্ভুত এই নারীজাত,এরা বৃদ্ধ প্রেমিকে শরীর পাবে না,সুরস পাবে না জেনেও

বার বার তবু ভালোবাসবেই!

আমি জরা ঢেলে দিলেও তোমার বাবার নারীর অভাব কক্ষনো হবে না!

 

মা তখন বসে বিশাল পালঙ্কে,

অশ্রুর পারাবারে একাকিনী বসে বলেছেন,’তবু,জরা,আমার স্বামীকে তুমি ঢেলে দাও যা কিছু তোমার আছে,

আয়না ধরলে সে যেন নিজেই কাঁদে,

রূপ চলে গেলে ভেঙে যায় সব পুরুষ-অহঙ্কার,

ওটুকুই হোক্!’

 

জরা মাথা নত,বলেছিল অস্ফুটে,আমি নিমিত্ত,

বাস নেই মোর,

সব কাজ করে প্রেম আর নারী,

সব শোক আর সব সুখে মজে রাধারাণি,মীরারানি।

জরা ঢেলে দেবো,তবুও তাদের থামানো যাবে না জানি!

চেয়ে দেখি,শাম্ব ভাইটি বিকৃত দেহে বনের মধ্যে ঢোকে,

মাও কেঁদে সারা।

 

দূরের বাদ্যে খেলা ও পুষ্পে বাবা তবু দিশাহারা!

কী এমন আছে এই কালো পুরুষে?

আকাশের থেকে দেববাণী আসে ভেজা ভেজা বাতাসে

প্রেম তো আসলে শিল্পই,সেই শিল্পের অভ্যাসে,

জন্মাষ্টমীও মিলে যায় একটি প্রেমভরা দিবসে,

প্রেমের দিনটি এই,

কালো ও কোমল,হোক্ অন্যায়ী তবু

আতরে,আতরে সুধাবিষে তার আয়ু,

সে নায়ক,

তার দিকে

নারীর আবেগ,নারীর নাছোড়

জেগে থাকে ভরাবেগে।

 

আজ পুরুষের দিন,

আজ প্রেমিকের দিন,

আজকে প্রেমের দিন,

আজকে নারীর স্বপ্নের আর অশ্রুর দিন মিলে

একমেবাদ্বিতীয়মে

মিশে যায় নীলে নীলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *