রাধা — দেবেশ ঠাকুর Radha kobita Debesh Thakur

প্রিয়জনের কাছে শেয়ার করুন :—

(একটি চিঠি। এই সময় চলছিল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ। কৃষ্ণের ভূমিকা যেখানে অনন্যসাধারণ। এমন এক সময়ে বৃন্দাবনে রাধার মনে পড়ে তাঁর প্রিয়তমকে।নানা কর্তব্য কর্মে যিনি ভুলে গেছেন হয়ত বৃন্দাবনের গোপজীবন এবং রাধাকে)।

 

প্রিয়তম-

সম্বোধন কি অন্য কিছু হলে ভালো হতো?

যুদ্ধক্ষেত্রে কেউ কি অন্যের চিঠি পড়ে?

প্রয়োজন নেই এমন সম্বোধনে, হয়ত অধিকারও নেই

তাহলে সুহৃদ কিংবা বন্ধু লেখা যাক

সম্বোধনে কাজ নেই,

তোমার জন্য কোন সম্বোধন পৃথিবীর অভিধানে নাই

 

তুমি আজ যুদ্ধক্ষেত্রে

চারিদিকে রক্ত অস্ত্র ক্ষমাহীন মৃত্যুর পাহাড়

তুমি সুস্থ থাকো ভালো থাকো আমার পরমায়ু নিয়ে

তোমাকে না ছোঁয় যেন যুদ্ধের উষ্ণ বালুকণা

অক্রুর যেদিন তোমায় নিতে এসেছিল

আমরা অনেক বলেছিলাম,

চোখের জলে পিছল করে দিয়েছিলাম তোমার রথের পথ

শুয়েছিলাম তোমার যাত্রাপথে তবু তুমি চলে গেলে-

বলেছিলে আবার আসবে।কবে কবে কবে পুরুষোত্তম?

কবে আবার আসবে রাজা দুখিনির কুটিরে?

এবার এলে দেখবে তোমার সেই প্রিয় ধবলীর দুটো দুষ্টু বাছুর,

যমুনার সেই কদম গাছটির একটি শিশু চারা

সেই তমাল বনে বাসা বেঁধেছে রঙবেরঙের প্রজাপতি

আমার প্রতিদিন গাঁথা গুঞ্জমালা শুকিয়ে যাচ্ছে রোদ্দুরে

তুমি কি আর কোনদিন পরবে না-

 

তোমার সামনে এখন দ্রোণাচার্যের রথ

পিছনে তোমারই সংসপ্তক সেনা

শল্ব মুষল একাঘ্নি অগ্নিবানে আচ্ছন্ন আকাশ

চারিদিকে বাণবৃষ্টি সুদর্শন চক্রব্যূহ

বাজছে তোমার পাঞ্চজন্য মেঘের মত

 

এমন দিনে তোমার কি একবারও মনে পড়ে

সেই তমাল বনে বৃষ্টি, সেই মেঘের ডাক

কুঞ্জের পথে অন্ধকারে দুজনে পথ হারিয়েছি

ছপ ছপ বাদল রাতে দু-ই পথহারা পাগল

ওপরে ক্রন্দসী আকাশ

তুমি আমায় বলেছিলে, আমার প্রাণ

আমার জীবন আমার স্বপ্ন সব তুমি

মনে পড়ে না তোমার

চন্দ্রাবলীর কুঞ্জে যাওয়ার জন্য সেই অভিমান

সেই তুমি এলে ভৈরবের সাজে

জটাজাল রুদ্রাক্ষ ত্রিশুলে লুকিয়ে ছিলে নটবর বেশ

আমার মান ভাঙাতে বলেছিল,

দেহি পদ পল্লব মুদারম্-

সেই তুমি বিশ্বরাজ জগদীশ্বর লুটিয়ে পড়েছিলে

এই দাসীর পায়ে-

কী লজ্জা কী বোকা ছিলাম তখন

আজ মনে হয়, একবার তোমার পায়ে

নিবেদন করি আমার সব লজ্জা

বলি, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো আমায়, আমি তোমারই-

হয়ত এরই নাম দ্বিচারিতা।স্বামীনিন্দা মহাপাতক-

আমার স্বামী আয়ান ঘোষ ,শাশুড়ি জটিলা আর ননদ কুটিলা

চারদিকে বিবর্ণ দেওয়াল

দুধের হিসাব কষতে গিয়ে কখনো যারা আকাশ দেখেনি

তুমিই আমাদের দেখিয়েছিলে সোনার আকাশ

পদ্মপাতায় ফলে আছে মুক্তোফল

 

প্রথম জ্বালিয়ে গেলে প্রদীপ যার আলোয়

জানলাম আমি শুধু কারও স্ত্রী কারও পুত্রবধূ নই

আমি একজন সম্পূর্ণ মানুষ ষড়ৈশ্বর্যশালিনী আমি রাজেন্দ্রনন্দিনী

অবলা সরলা কুলবালা থেকে আমার নারী হওয়া মানুষ হওয়ার শুরু

আর তুমি আমার দর্পণ যাতে নিজেকে দেখেছি

 

দাসী নই আমি,আমি ব্রজরাজেশ্বরী

আমি রুক্মিনীর বেশবাস জানি না-

সত্যভামার বীরত্ব জানি না জাম্ববতীর প্রেম জানি না

আমি রাধা- আমি সম্পূর্ণা আমি আলোক সামান্যা

বিশ্বরাজের প্রেমে আমি সর্বোত্তম

তবু বলি, যুদ্ধের শেষে, দিনান্তে যদি পারো একবার এসো আমার ঘরে

নিন্দিত আমায় নন্দিত করো পূর্ণ করো দীপান্বিত করো।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *