শেষ পটচিত্র — দেবেশ ঠাকুর

প্রিয়জনের কাছে শেয়ার করুন :—

যশোদা জানতেন,কানাই বলাই ফিরে আসবে

নন্দ জানতেন, সখাগণও জানতেন তাই।

গোপীদেরও জানা ছিল,ব্রজে ফিরবেন ব্রজরাজেশ

 

মথুরায় নিয়ে যেতে রথ এনেছেন অক্রুর

ললিতা বলে, কেন তুমি নিয়ে যাচ্ছ ব্রজেশ্বরকে?

বিশাখা বলে, অক্রুর না ক্রুর হে তুমি?

অনঙ্গমঞ্জরী বলে, জানো না কংস কত নির্মম!

 

একমাত্র রাধা জানতেন, ফেরা আর হবে না—

কুঞ্জবনের গাছগুলি ডালপালা নিচু করে

শ্রীকৃষ্ণের চরণ ধরে আটকাতে চায় গতি,

কদম্বের অশ্রু ঝরে তমাল-বনে

তমালের চোখের জল কালীদহে

কালীদহের কান্নার স্রোত যমুনায় বয়—

 

কৃষ্ণ তখন রাধারানীকে একান্তে বলে উঠলেন,

কেন জানিনা আজ তোমাকে মনের মত

সাজিয়ে দিতে ইচ্ছে করে,

মোহন ঠোঁটে মোহন হাসি ছড়িয়ে বলেন মদনমোহন,

রমণীর সাজ পুরুষ বোঝে ,কোন অঙ্গে কিসের শোভা!

প্রশ্ন করেই রাধারমণ পড়তে বসেন রাধার মন।

 

এই প্রথম রাধাকে নিজের হাতে সাজাতে বসেন কৃষ্ণ

পাদপীঠে রাধাকে বসিয়ে নিজে বসলেন পদতলে,

— নারীগণ সাজ শুরু করে কবরী থেকে গণ্ড থেকে—

কৃষ্ণ বলেন, আমি না হয় শুরু করি চরণ থেকে

 

কোলে তুলে নিলেন পদ্মকলির মত পা দুখানি

নানা বর্ণে শুরু করলেন অলক্তরাগ

লতা গুল্ম পুষ্প পত্র ভ্রমর আঁকলেন মনের মত

গোরির চরণ কোলে নিয়ে হরি আকছেন প্রকৃতি-রূপ।

তুলিকা ধীরে-ধীরে ঊর্ধ্বগামী,

কত পল কত দণ্ড কত প্রহর কেটে যাচ্ছে চিত্রকলায়।

নাভিমূলে ষোড়শদল পদ্ম

হৃদ্ মধ্যে শতদল

ভুবনমোহনের তুলিতে হ্লাদিনীর দেহে

আঁকা হচ্ছে চরাচর

দেহপটের ক্যানভাসে মেঘ-বৃষ্টির রূপকথা

মহিমাময় মাধুর্যে শ্রীমতীর চোখ বন্ধ

কমলকলির মত দশটি আঙুলে

দশদিশির দিগন্তরেখা

সূর্যাস্তের সাবনকান্তি ঐশী বর্ণচ্ছটা।

নীলাম্বরীর চিবুকে দিলেন লোধ্ররেণু,হিরকচূর্ণ

গণ্ডদেশে অপরাজিতার নীলধ্বজ

মেঘ ছানিয়ে চোখের নিচে কাজল দিলেন পরম স্নেহে

ললাট ‘পরে শ্বেতচন্দন অগণিত চিত্রকলা

পরিশেষে কবরীছাঁদ নিবিড় নিটোল

মুক্তধারা কুন্তলে মান ভুবন ছোঁয়া—

 

চিত্রকলার শেষ না হতেই রাধা বললেন,

অনন্তকাল স্নান না করে

ধরে রাখবো জগন্নাথের জগত-কলা!

 

কৃষ্ণ বারবার চোখের কাজল এঁকে ক্লান্ত

যতবার আঁকেন ততোবার শ্রীমতীর

চোখের জলে ধুয়ে যায়,

যেমন করে বৃষ্টি ধুয়ে যায় কালো মেঘের ঘনঘটা।

 

চোখের জলে নৌকা বেঁধে উঠে বললেন রাধারানী,

জানি তুমি আর কোনদিন আসবেনা শ্যাম, ব্রজপুরে

একটিমাত্র পুণ্য স্মৃতি আমায় দেবে?

পূর্ণ স্মৃতি চিরদিনের জন্য দেবে?

তোমার বাঁশি।

আর কোনদিন কোথাও যেন বাজিয়ো না

ওই মুরলী, হে মুরলীধর—

 

অজান্তে কি পাঞ্চজন্য তুলে নিলেন সেদিন থেকে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *