বাইশে শ্রাবণ, ১৩৪৮ — যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত

প্রিয়জনের কাছে শেয়ার করুন :—

মেঘচাপা পূর্ণিমা,

আর সারি-সারি মুখঢাকা রুদ্যমান আলোয়

শহরের নিষ্প্রদীপ রাত শ্রাবণ-সমাচ্ছন্ন।

আলো নিবল,

রাত কাটল,

পূর্ণিমা ছাড়ল,

কিন্তু প্রভাতের কপালে

আজ আর সূর্য উঠল না।

এমনি দিনেই,

এমনি শ্রাবণঘন গহন মোহে,—

কাননভূমি যখন কূজনহীন,

সকলের ঘরে যখন দুয়ার দেওয়া,—

একেলা পথিক গোপন তার চরণ ফেলে

 নিশার মতো নীরবে পথ চলে।

শহরে তা অশোভন,

শহরে তা অসম্ভব।

পথিকের বাঁধাপথ আরও বেঁধে দেওয়া হয়েছে__

কলুটোলা স্ট্রিট, কলেজ স্ট্রিট,

কর্ণওয়ালিস স্ট্রিট হয়ে

পথিক যাবে।

তারই একটা মোড়ে__

সহস্র নিরুপায়ের ভিড়ে দাঁড়িয়ে ভিজছি।

দূর হতে কানে আসছে —

বিপুল পরাজয়ের তুমুল জয়ধ্বনি!

              সহসা দেখা গেল —

মরণের কুসুমকেতন জয়রথ।

মনে হল —

কি বিচিত্র শোভা তোমার —

 কি বিচিত্র সাজ!

জয়ধ্বনির মধ্যে জোড়া-জোড়া জোয়ান

আজ মৃত্যুমদে মাতাল হয়ে

টানছে সেই যান।

টলছে যত তাদের পা,

দুলছে ততো রথের বিজয়কেতু !

হায় রে! যেন —

               লটপট করে বাঘছাল,

            যেন —

               বৃষ রহি-রহি গরজে!

বাঁধাপথে অগণ্য নগণ্যের জনতা ;

তারই বুক দ্বিধা করে

সিধা চলেছে মৃত্যুস্যন্দন

তার কলুটোলা স্ট্রিট, কলেজ স্ট্রিট,

কর্নওয়ালিস স্ট্রিট পার হয়ে।

সেই জয়যাত্রা-পথের বাঁকে

পলকের জন্য তুমি কাছে এলে বন্ধু!

পলকের তরে চোখে পড়ল তোমার মুখ!

মরণের অভিনন্দনে

সে মুখ কি অপরূপ হয়েছে বন্ধু!

মানুষের সকল পৌরুষ-প্রয়াস

বুকের পাটায় ঘষে-ঘষে

উঠেছে যে ব্যর্থতার চন্দন,

তাতেই হল তোমাব ললাট অভিলিপ্ত।

তাদের সকল প্রার্থনাকে পরিহাস করে

ফুটে উঠেছে যে ফুল,__

তাতেই রচিত হল তোমার মাল্য!

করজোড়ে, নতশিরে, প্রণাম করে বললাম —

বিদায় ; বন্ধু ; বিদায় !

মরণের হাতের লীলাকমল, তুমি,

সদ্যছেঁড়া সহস্রদল পদ্মের মতোই ভেসে

শোকের বারদরিয়ায়,’

অগণিত নগণনীয়ের নাগালের বাইরে।

পরম অভিমানে তারা ছুঁড়ে –ছুঁড়ে ফেলছে

তাদের নিম্ফলা ফুল ।

আমি ফুল দিইনি বন্ধু,

আমার পথে ফুলের দোকান পড়ে না।

আমি বলতে এসেছিলাম —

           হৃদয়বন্ধু, শোনো গো বন্ধু মোর

কিন্তু তুমি তখন

আমার কথার বাইরে চলে গেছ।

তাই শুধু চোখের জল মুছে

চোরের মতো চুপিচুপি ঘরে ফিরছি।

ফেরার পথে, পরাজয়ের জয়োল্লাস

 মৃদু হতে- হতে আর শোনা যাচ্ছে না।

শুধু তার প্রতিধ্বনি উঠছে অন্তরে,__

           আজি পিঞ্জর ভুলাবারে কিছু নাহি রে।

আর সাথে-সাথে

রিকশওয়ালার ঠুনঠুনিতে সান্ত্বনা বাজছে —

               কি বিচিত্র শোভা তোমার,

               কি বিচিত্র সাজ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *