মফস্বল ও একটি ভাঙা পরিবার — শ্বেতা চক্রবর্তী 

প্রিয়জনের কাছে শেয়ার করুন :—

মা

 

বেকার ছেলের সঙ্গে যেইদিন ঘর ছাড়লাম,

তুমি যেন সব বুঝে নিশ্চুপে উঠে গেলে তেতলার ঠাকুরঘরেতে;

সেদিন বিষ্যুদবার ছিল,অথৈ শ্রাবণমাস,সুর করে লক্ষ্মীর পাঁচালি

সেদিনও তোমার সম্পদ;

নীচে নেমে দেখেছিলে জামা-শাড়ি কিছুই নিইনি,

বইয়ের তাকটি শুধু ফাঁকা ফাঁকা লেগেছিল খুব,

জলের ভেতরে বালি রূপনারাণের পারে আজও চিকচিক,

সে দেশের মেয়ে তুমি—শাল ও শিমুল বনে গচ্ছিত স্মৃতি…

পরদিন পাড়ায় রাষ্ট্র হল;বনবিতানের গন্ধ

সামাজিক মানুষেরা পশুরও অনেক আগে পায়;

হাসি, টিটকারি ক্ষতি তোমার গোপন জিহ্বাকে

করেনি কৈফিয়তে গুরুভার, আভিজাত্যহারা,

ধীরে ধীরে বলেছিলে উত্তপ্ত বনের মৃগী তুমি,

‘বিদুষী আমার মেয়ে,জামাই বেকার তাতে কি?

আগামী বছর ঘিরে আসুক তো দু’ তিনটি নাতি-নাতনি,

সবাইকে খাওয়াবে মেয়ে নিজস্ব আয়েই,

ভরা শ্রাবণের দিনে ক্ষত হলে মাটি এসে মুছে দেবে মাটির বিশ্রী।’

 

মেজদা

 

লুঙ্গি পরা কোনওদিন পছন্দ করেননি বাবা,

নিজেও পরেননি;বর্ষাকালে চারটি পাজামাই

ভেজা থাকলে ধুতি পরতেন আর কবেকার গ্রাম্য জমিদার

আরেকবার জেগে উঠত বাবার ফরসা দেহে, ফরসা ধুতিতে,

পাশাপাশি মেজদাও যেন বাবাকে রাগাতে

 

কম পয়সার লুঙি পরে খরচ কমাচ্ছি গোছের

ভাবভঙ্গি করে সকালে টিফিন সেরে পাড়ার মোড়ের রোয়াকে

বাজার ফেরত বাবাকে আসতে দেখলে ‘দাও, দাও !তুমি এত

বইতে পারছ

না!

বাবাও সংক্ষিপ্তভাষী— ‘না, থাক্ !

আবার মেজদা রোয়াকে;

বন্ধুরা পটপট সব ভাল ভাল পাশ করে উচ্চপদে অফিসে,আরামে

;

আর মেজদা?

 

এই তো সেদিন অরবিন্দ বালিকা বিদ্যালয়ের

ক্লাস নাইনের মেয়েটা হঠাৎ রাস্তায় পড়ে গেছে,

তীব্রগতি লরিটিও অত ক্ষিপ্র ছিল না যে মেজদাকে হারাবে;

লুঙি পরে বড় লাফ, মেয়েটি বাঁচল আর খোলালুঙি মেজদা

শুয়েছে রাস্তায়, দেহ ছিঁড়ে ফেড়ে গেছে, লুঙি নয়;

বাবা এসে নির্বাক, নিরশ্রু পায়ের কাছে বসে লুঙি টেনে

ধীরে ধীরে ঢাকলেন বখাটে ছেলের থাই, জঙ্ঘা,বলিষ্ঠ ঊরু…

 

ঠাকুমা

 

ভুল অপারেশনের ফলে বাম চোখ নষ্ট হওয়া তিনি যেন

প্রবাদের হরিণাটি যে হৃদয়-অক্ষি ব্যবহারে

ডানবাম সবদিক অনুভবে সব বুঝতেন;

ত্রিসন্ধ্যার মালাজপ,দীক্ষাগুরু অশ্রুর দেবতা;

বসলেই লালকে।কাতর বিগলিত ধারা!

কাঁদো কেন গো?’বিরক্তি ও বিস্ময়ের সেই ছেলেবেলা;

উত্তরও সামান্য,‘কাঁদতে ভালো লাগে।’

‘ওসব বিলাস বুঝলি বুড়োবুড়িদের!’মন্তব্য মাসির।

মায়ের পরের বোন, বিয়ে হয়নি,আমাদের বাড়িতে থাকতেন।

ক্ষীণদেহ,মেচেতার গালে হাসির ভাঁজ পড়তই না!

 

ঠাকুমা দেখতেন চোখ তুলে।হাসতেন।

পুরনো প্রজন্ম যেরকম:খাতায় ক্ষমার গান;

চুরি করে যতবার পড়েছি,কেঁদেছি—মাসিও কেঁদেছে,

স্বামী নেই,শিশু নেই— তবুও মায়ের মতো কেঁদেছে!

 

ছোট বোন

 

আস্ত পাগলি ছিল একটা—ভরা পঁচিশেও

সাপলুডো খেলতে বসে হেরে গেলে লুডো উলটে দিত,

মৌলালির রথের মেলায় চুড়ির পর চুড়ি— কাচে হাত

কেটে গিয়ে রক্ত বইলে —‘তবু পরব!’

একটু কালো, পোলিওতে পা একটু বাঁকা,

বারোবার বসেছে ও পাত্রপক্ষ উঠে চলে গেছে, ফেরেনি;

সন্ধ্যায় নাকিকান্না— ‘কেন এত কালো হলাম গো!’

 

সদ্য বিবাহিতা সখীসব ঘরে এলে

‘কী, কী হল বাসররাতে,বল!বল্!বল্!’

রাহুর গ্রাসের থেকে মুক্তি পেয়ে হলুদ-কালো চাঁদ

অনেকক্ষণ বসে ভাবত, সখীরা গিয়েছে চলে,

স্বপ্নে মানিক জ্বলছে দোলামাথা বোন আর অন্ধকার ছাদ…

 

সেজো মামা

 

রাঁচিতে পাঠাতে হয়নি, কলকাতার উপকণ্ঠে মোটামুটি পরিচ্ছন্ন

উন্মাদাগারেই তাঁর বাস–দশ বছরেরও বেশি হবে,

এক যুগ ছুঁই ছুঁই—মাঝেমধ্যে বাড়িতে আসেন, বেড়াতে;

আম খেতে ভালবাসতেন,হয়তো তাই,প্রায়শই গ্রীষ্মেই ছুটি;

বড় প্লেটে আম শেষ মুহূর্তেই এক-দুই-তিন !

আবার সে সাদা বিছানা,পাশে ধূসরাভ কবিতার খাতা;

 

বৈদুতিক শক খেয়ে দু’-চারদিন লেখা বন্ধ,

ও সময়টা তাঁর মতে ইন্দ্রজালের, দেবতার ভাষা নাকি

ও সময় বুঝে নিয়ে পরবর্তী কবিতায় বসা!

পাড়ার ছেলেরা দয়া করে শারদীয় পাড়াপত্রিকায়

দু’-চারটে ছাপায়—চা-বিড়ির টাকা পায় বদলে,

আধময়লা বালিশের নীচ থেকে দশ-পাঁচ টাকা

দরাজ হাতে বের করে মামা বলেন—নে!

ওরা তো ঠকায় মামা, তুমি বোঝো না?মামার প্রসন্ন হাসি—

থাক,থাক!কবিতাকে অর্থ দিতে হয়,জীবনও !

 

বর্ষায় বাজ বিদ্যুতে এ মামাই চমকে উঠে ভয়ে

কবিতার জীর্ণ খাতা আঁকড়ে ধরে বিছানায় শুয়ে

বিড়বিড় সে কী বকা কবিতে কাঙালে,

 

গোপাল না,রাখাল না,বাংলাদেশের এই এক ছেলে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *