সুন্দর তুমি খুঁজিয়া ফিরিছ কারে ?
নাই সে খোঁজার আদি আর অবসান।
সুরের দূতীরে পাঠাও কাহার দ্বারে ?
নাই সে জনের কোথা কোনো সন্ধান।
তুমি শুধু সুর, তুমি পথে চলা সুর,
তুমি চলি’ যাও বাঁশিতে বাঁশিতে বেজে।
দূর হতে আসি’ নিকট, পালাও দূর
এক যুগ হতে আর যুগে চলা এ যে।
তোমার খোঁজার সমারোহ দেখে মরি
ওগো সুন্দর, এত জানো ছলাকলা !
কত রূপ কত বর্ণ বিকাশ করি’
গন্ধে ছন্দে অবিরাম তব চলা।
প্রাতে খুলে ফেলি’ যামিনীর যবনিকা
চিনিবার তরে কার মুখ তুলে ধরো !
ঊষার অলকে আঁকি সিন্দুর লিখা
মেঘে চুম দিয়া সরমে অরুণ করো।
সারা দিন ছোটো হেথায় হোথায় মিছে
আলোয় উজলি’ মুগ্ধ ধরণী সারা
দিনশেষে তবু বারুণীর পিছে পিছে
মশাল ধরিয়া তিমিরে হও যে হারা।
লক্ষ নয়ন ফুটে ওঠে দিকে দিকে
নিশিভোর চলে শুধু খোঁজা, শুধু খোঁজা
ছায়াপথ বেয়ে চরণচিহ্ন লিখে
অসীমের মাঝে ছুটে বাহিরাও সোজা।
যৌবন, তব পথপাশে জাগে হাসি
কুসুমে কুসুমে মাতামাতি কানাকানি
কেলিকদম্ব ঝরায় মুকুলরাশি
কুঞ্জে কুঞ্জে ফুলবাণ হানাহানি।
রঙে রঙে তুমি রাঙাইলে দিশি দিশি
রঙের নেশায় সৃজিয়া চলিলে কী যে
কালো হয়ে গেল সব কটি রঙ্ মিশি’
তুমি যে কালিমা অঙ্গে মাখিলে নিজে।
ওগো যৌবন, ওগো চির যৌবন,
নিতি নিতি তুমি জাগাও নবীন প্রাণ
জরারে জোগাও সবুজের রসায়ন
কচি ও কাঁচায় শক্তির অভিমান।
এত করি’ তবু হয় নাকো মনোমতো
প্রিয়ার লাগিয়া আরো কিছু বুঝি চাই
মরণ সাজিয়া ভাঙোসবি অবিরত
কচি ও কাঁচা ও জরতীর ভেদ নাই।
ওগো নিষ্ঠুর সুন্দর, ওগো কালো,
কোথা পেলে ঐ সাপ খেলানোর বাঁশি !
দিকে দিকে কী যে সুরের আগুন জ্বালো
যারা শোনে তারা ঝাঁপ দিয়ে পড়ে হাসি’
এক দিক হতে আর দিকে পড়ে সাড়া
নৃত্যের তালে চরণে শিহরে সুখ
উদ্দাম বেগে ঘুরে মরে রবিতারা
বিপুল ব্যথায় দোলে সিন্ধুর বুক।
কুহকী ! এত যে কুহক লাগাও প্রাণে
বিশ্বের প্রতি কণায় স্বপন সৃজে
আমরা বৃথাই খুঁজে মরি ওর মানে
তুমি শুধু হাসো, হয়তো জানো না নিজে।
বিশ্বের তুমি শোভারূপ, তুমি কান্ত
ফোটা সুষমার নির্যাসে তুমি গড়া
মনোহর তুমি হয়ে ওঠ অবিশ্রান্ত
তোমার মাধুরী তোমারি সৃজন করা।
এত সুন্দর তবু তুমি চাও কারে ?
খুঁজিয়া বেড়াও কী বিপুল পূর্ণতা ?
কত কী গড়িলে নিজ হাতে বারে বারে
মন ভরিল না, করি’ করি’ দিলে চূর্ণ তা’।
জানি জানি, তুমি কী ধন খুঁজিয়া ফির
কার তরে তব অবিরাম অভিসার
পাইলে না, তাই বিরহী সেজেছ চির
যত বার গেলে ফিরে এলে তত বার।
নিখিলের রূপ কেঁদে মরে যার তরে
সে যে নিখিলের বক্ষে লুকানো প্রীতি
তারে তুমি যত চাহিলে বাহিরে ঘরে
পাইলে না, তুমি নাহি জানো তার রীতি।
সে আছে তোমার অন্তর আলো করি’
সে আছে তোমার বাঁশরির সুরে বাঁধা
তুমি ঘুরে মরো সারাটি গোকুল ভরি’
তোমারি বক্ষে লতাইয়া আছে রাধা।
পথ খোঁজা রীতি ঘুচিবে তোমার কবে ?
চলিতে চলিতে কবে দাঁড়াইবে থেমে ?
সুন্দর, তুমি প্রেমিক যেদিন হবে
সুষমা সেদিন সার্থক হবে প্রেমে।
জানি জানি কভু আসিবে না হেন দিন
তুমি নিষ্ঠুর, প্রেমপাশ যাও টুটি’
তুমি তো পালালে মথুরায় উদাসীন
বিরহিণী রাধা ভূতলে পড়িল লুটি’।
সেই তুমি কভু প্রেমে কি পড়িবে ধরা ?
সুচির বিরহ, বিলাস তোমার সে যে !
তুমি শুধু সুর, শুধু পথ খুঁজে মরা,
তুমি চলি’ যাও বাঁশিতে বাঁশিতে বেজে।
