রতি — শ্বেতা চক্রবর্তী 

প্রিয়জনের কাছে শেয়ার করুন :—

নিজেকে শ্রদ্ধা করতে আমি পরি গাঢ় রঙের শাড়ি,

ঠোঁটে দিই বাঁধভাঙা লিপস্টিক,

নিজেকে শ্রদ্ধা করতে আমি দুচোখে কাজল লেপি যেন

অশোকগাছের কাণ্ড এফোঁড় ওফোঁড় করে চলে গেল

বিষ্ণুচরণের দামাল তিরটি,

একটুও কি কষ্ট হয় নি গাছের?

আমারই মতন?

 

নিজেকে নিজের মতো সাজাতে সাজাতে নারী আসলে নিজেকে

শ্রদ্ধা করতে শিখে যায়!

 

নিজেকে শ্রদ্ধা করবো বলে আমি নখরঞ্জনীও মধুর করে টানি,

বুকের কোল ছাপিয়ে ফেলে দিই একটা কালো রঙের মুক্তোর

মালা!

মুক্তো আবার কালো হয়?

হবে না কেন?

 

নিজেকে শ্রদ্ধা করতে করতে আমি সন্তানের বাহুর ওপরে

নিজের খোলা বাহু রেখে তুলে ফেলি নানা বর্ণময় ফোটো,

লাল চেলির মতো কিছু একটা খোলা বুকের ওপর ছুঁড়ে দিই,

যেন হরির লুঠের মুগ্ধ বাতাসা!

 

আসলে সমাজ বোঝেই না

নারীই দ্রৌপদী আবার নারীই নিজের মর্জিতে নিজের দুঃশাসন!

 

নিজেকে শ্রদ্ধা করতে আমি কোনো কৃষ্ণসখা রাখি নি,

রাখি না কোনো সমব্যথী গোপী,

ভড়ং করি না জয়দেবীয় পূর্ণিমারাতের,

পৌর্ণমাসীর কথা বিধবার তরুণ সফেদ শাড়ির মতো আমি ত্যাগ

করে

অর্জুন গাছের গায়ে নিজের ছাল মুছি,

ছিঁড়িও নিজেকে অকাতরে!

 

নিজেকে শ্রদ্ধা করি বলে আমি অতঃপর রক্ত মুছি,

নারী মানে সংসার,

নারী মানে স্বামী,

নারী মানে প্রেমবহ্নি নিভিয়ে ঘরের শেষপ্রান্তে নিভৃত শয্যা,

কিছুতে না মানতে মানতে আমি নিজেকে শ্রদ্ধায় চুমুচান করাই!

 

এমন বর্ষায় আমি চুপচাপ সামনের বনে ঢুকে স্নান করি,

সাপের খোলসের মতো ফেলে আসি ভেজা শাড়ি,

নিশুত রাতে ঘরের বারান্দায় একা উলঙ্গিনীকে চাঁদ দেখে,

নিজেকে শ্রদ্ধা করি বলে আমি গভীর রাতে চাঁদ কুড়োই,

কুড়িয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে চাঁদের সূক্ষ্ম-তন্তুু শাড়িটি ছাড়া আর

কিচ্ছু রাখি না শরীরে!

 

নিজেকে ভালোবাসি বলে এসব নিদারুণ রাতে পুরোনো

প্রেমিকের ফোন এলে তুলি না!

নারীকে নারীর মতো থাকতে দাও…

বলতে বলতে ঘুমের গহনে ডুবে যাই…

 

নিজেকে শ্রদ্ধা করতে করতে স্বপ্ন দেখি নিজের বিবাহের,

কুশণ্ডিকা জ্বলছে,

কেবল ওদিকে কোনো পুরুষ নেই,

একজন পুরোহিত মন্ত্র পড়ে চলেছেন,

স্পষ্ট উচ্চারণ তাঁর,নির্ভুল,

আমি নিজেকে নিজে সম্প্রদান করছি,

মোক্ষ মাত্র অন্য-নিরপেক্ষ নারী,

শাস্ত্রজ্ঞ পুরোহিত হাসছেন…

 

ঘুম ভেঙে যায়,

বৃষ্টির শব্দ,ভোরের পাখির ভালোবাসায় জানলা খুলে দাঁড়াই,

নিজেকে আয়নায় দেখি

মহুয়া বনের শেষ গুপ্তচরী!

 

আমার জরায়ু আমারই রক্তমালা,

আমার স্তন আমারই দিগন্তভেদিতা,

আমার জঘনে আমিই একচ্ছত্রা,

 

আমার প্রতি আমার শ্রদ্ধার শেষ নেই!

আমার প্রতি আমার ঘুমের শেষ নেই!

জাগরণেরও!

 

আমার ঝুঁকে পড়া মাথা আর নুয়ে পড়া ডান হাতটিকে আমার পা

দুখানির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলি,

নাও,প্রণাম করো।

 

আমি নারী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *