দুর্গা (কবিতা) – দেবব্রত সিংহ

প্রিয়জনের কাছে শেয়ার করুন :—

ও বিল্টু, তুই এখন কোথায় আছিস বাবা

তুই এখন আছিস কোথায়,

হাসপাতালে তোর বাপ বলেছিল,’ছেলে তো অন্য ঘরে’

সেই ঘরটা কোথায় রে,

আমি সব ঘর দেখেছি ঘুরে

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে আমি ঘুরে দেখেছি সব ঘর,

কোথাও তোর দেখা পাইনি

দেখা পাইনি কোথাও ।

তারপর আর কী

তারপর ছুটির কাগজ হাতে তোর বাপ যখন আমাকে নিয়ে

গেট পার হয়ে নামল বড় রাস্তায়,

তখন দেখলাম গোটা কলকাতা শহর মেতে উঠেছে পুজোর

আনন্দে,

গোটা কলকাতা শহর সেজে উঠেছে পুজোর আনন্দে,

মণ্ডপসজ্জা, প্রতিমা, আলো আরো কত কী

মোট কথা কোথাও কিছু কম পড়ে নাই রে

কোথাও কিছু কম পড়ে নাই ।

তোর বাপ আমাকে বাড়িয়ে বলেছিল অনেক কথা

আমি সেসব পাইনি দেখতে কিছুই

ওই যে রে মগজজীবী না বুদ্ধিজীবী কীসব বলে না

সেইসব বড় বড় বাবুদের মোমবাতি হাতে মিছিল টিছিল

আমি কিছুই দেখতে পাইনি,

তোর বাপ মানুষটা চিরকালের বড় হুজুগে মানুষ,

কাগজে বেরুনো তোর ছবি পর্যন্ত যত্ন করে রেখেছে কেটে

কুলপি’র গ্রাম থেকে দমদমের খালপাড়ের বস্তি

বাবুদের ঘরে বাসন মেজে ঘর মুছে কাজের মাসির কাজ

সে দেখতে দেখতে পার হয়ে গেল দশটা বছর,

আমি জানিরে বিল্টু

আমি সব জানি,

কাজের মাসির আট বছরের শিশু বোমার আগুনে ঝলসে গেলে

কাজের মাসির আট বছরের শিশু বোমার আঘাতে

মায়ের হাত থেকে মুখ থুবড়ে ছিটকে পড়লে,

আতঙ্কে যন্ত্রণায় ‘মা-গো মা-গো’ বলে চিৎকার করলে

‘বাবা জ্বলে যাচ্ছে, জল দাও আমায় জল দাও’ বলে কাতরে

উঠলে,

বড়জোর বাবুদের টিভিতে আর কাগজে

দু’চার দিনের খবর হতে পারে

তার বেশি কিছু না

তার বেশি আর কিছুই না ।

এখন বাবুরা সবাই খুব ব্যস্ত রে বিল্টু

মা আনন্দময়ীর আগমনে বাবুরা এখন ব্যস্ত সবাই

মণ্ডপসজ্জা, প্রতিমা, আলো,

কোথাও কিছু কম পড়ে নাই রে

কলকাতা শহরে কোথাও কিছু কম পড়ে নাই,

শুধু একজন কাজের মাসির…….

থাক সে কথা

জানিস বিল্টু,

এবার আমি ভেবেছিলাম মুখ দেখবো না ঠাকুরের

আর কক্ষনো দেখব না ওই মুখ,

তারপর কী হল জানিস

কাগজের লোকেরা প্রথম পাতায় যে ছবিটা ছেপেছিল তোর

সেইযে রে লাল চেক জামা পরা

তোর ডাগর চোখে চেয়ে থাকা সেই ছবিটা,

সেটা বুকে চেপে আঁকড়ে ধরতেই

বুকের ভিতরে কেমন যেন একটা হতে লাগল আমার,

তখনই ঠিক করলাম যাব

ঠাকুর দেখতে আমি যাব

একাই যাব,

হাত জোড় করে মাকে বলব,

মাগো আমি খালপাড়ের বিল্টুর মা সীতা

জন্মের পর বেছে বেছে এই নামটাই রেখেছিল আমার মা

কেন রেখেছিল

কী ভেবে রেখেছিল

সে আমি জানিনা

তোমায় মিনতি করি মা

তুমি আমার সীতা নামটা বদলে দিও

জনম দুখিনী সীতা নামটা বদলে দিও,

আমি আর সীতা হতে চাইনা মা

এবার আমি দুর্গা হতে চাই

অসুরদলনী দুর্গা

শিশুঘাতী অসুরদলনী দুর্গা ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


কবিকল্পলতা অনলাইন প্রকাশনীতে কবিতার আড্ডায় আপনার স্বরচিত কবিতা ও আবৃত্তি প্রকাশের জন্য আজ‌ই যুক্ত হন।